জীবনে আমি কোনো বিশেষ স্থানে উপনীত হতে না পারলেও সবার মতো আমারও একটা ছোট বেলার কাল ছিল বৈকি ,যেমন সকলের থাকে ,তাই এই নিবেদন আপনাদের জন্যে।
আজকের অনুভূতিতে বলছি , স্কুলে জাওযার পথটা অনেক দূরে মনে হতো,কেন জানিনা। সেই কদমতলা মোর থেকে ডানদিকে বেঁকে ভোলাদের বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে বেনেদের ঘাট ,কালীমন্দির পেরিয়ে ডানদিকে ঢুকে স্কুলের গেট। সে এক লম্বা জার্নি , সে আবার দিনে দুবার করে , সকালে আবার দুপুরে টিফিন খেতে বাড়িতে আসা ,আবার যাওয়া। কিন্তু দূরত্ব ছিল ৭৫০ মিটার যেটা এখন বুঝতে পারছি।
সবমিলিয়ে এক দুরূহ সুন্দর অনুভূতি ,মনে হত স্কুলটা যদি বাড়িতে হতো তাহলে কত ভালো ছিল। তবে বাড়িতে স্কুল হলে রাস্তার এবং স্কুলের বদমহেসি গুলো যে করতে পারতাম না সেটা তখন কিন্তু মাথায় আসেনি। যাইহোক স্কুল, বাড়ি আর খেলার মাঠ ,এই ছিল আমার বিশেষ গণ্ডি। মাঝে মধ্যে অবশ্য আসে পাশের বাড়ীর উঠোন খেলার মাঠে পরিণত হতো।
স্কুলের পড়াশুনার ব্যাপারে একটাই জিনিস মনে আসে ,মাস্টার মশাইদের হাতে মার খাওয়ার কথা, তা আবার বেতের ছড়ি দিয়ে ,হাতে রীতিমতো দাগ পড়ে যেত আর ভীষণ যন্ত্রনায় হতো। বাড়িতে সেকথা বলা যেত না কারণ বললে বাবার হাতে আবার মার্ খাওয়ার ভয় থাকতো। তবে সরস্বতী পুজোয় খুব আনন্দ হতো স্কুলে।
ছোটবেলা যেহেতু খুব একটা ভালো ছাত্র ছিলাম না তাই আর বেশি কিছু বলতে দ্বিধা হচ্ছে বটে। তবে বাড়ি ,পাড়াপ্রতিবেশী আর মামাবাড়ি এই ছিল ছেলেবেলার দৌড়ের পরিধি।
গ্রামের সেই দুরন্ত ছেলেটি কখন যেন একটি সরল শ্রেষ্টাচার নিরীহ বালকে পরিবর্তন হোলো তা সে নিজেই জানতে পারলনা। স্কুলের হেডমাস্টার থেকে শুরু করে পাড়ার বড়বাবু পর্যন্ত সবাই তার গুণমুগ্ধ। আর্থিক অনটনের কারণে প্রাইভেট টিউশন না নিয়ে নিজের চেষ্টায় মাধ্যমিকে এত ভালো রেজাল্ট করা চারটিখানি কথা নয় এই আশির গোড়ার দশকে , তা ও ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড থেকে।
সবাই সাইন্স
স্ট্রিম এ পড়াশুনো করার জন্যে উপদেশ দিলেও
ভবিষ্যতের খরচের কথা মাথায় রেখেই কমার্স নিয়ে ভর্তি হলো হাই ইস্কুলে।
রীতিমত দুবছর
ধারাবাহিক ভাবে পড়া চালিয়ে ডিস্ট্রিকে প্রথম হয়ে ইস্কুলের নাম রোশন করলো। খুবসম্ভব
তখনকার শিক্ষামন্ত্রী পাঠক সাহেব তাকে বোর্ডের তরফ থেকে পুরস্কৃত করেছিলেন। এসব কিন্তু সম্ভব হয়েছিল শুধু মাতৃভাষায় শিক্ষার বাবস্তায়।
তারপর কলকাতার
নামি কলেজ এ ভর্তি হওয়া। তখনকার দিনে কমার্স এ ফার্স্ট ডিভিশন এ পাশ করা খুব ই কঠিন
ছিল , একুলগুলোতে একজন দুজনই করতে পারতো ,তাই ভর্তি তে কোন অসুভিধা হয়নি।
এতদিন পায়ে
হেটে ই স্কুলে আসা যাওয়া চলছিল ,এবার কলকাতায় কলেজে যাতায়াতের খরচা ,কলেজ ফিস ইত্যাদি
মেটাতে টিউশন ধরতে হলো। বিকালে কলেজ থেকে ফেরার পরে লোকের বাড়িতে যেয়ে টিউশন পড়ানোর
কাজ। ভালো ছাত্র হওয়ার দৌলতে সেটার অভাব হয়নি কোনোদিন।
কিন্তু দিনের একটা সময়ে ক্লাবে যাওয়াটা নেশার মতো ছিল। একসাথে সবাই মিলে টিভি দেখা বা তাস ,কেরাম খেলার একটা আলাদা মজা ছিল বৈকি। তবে ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ দেখাটা অন্য মাত্রার ছিল।
যদিও একজন ছাত্র হিসাবে কিছু জিনিস করা বারণ ছিল তবুও করতাম নিছক আনন্দের
ছলে।
ক্লাব সম্পর্কে কিছু বলা উচিৎ , ক্লাবটি তখন একটা ফ্রি মেডিকেল সার্ভিস দিতো , সপ্তাহে একদিন এলাকার কোনো এলোপ্যাথি ডাক্তার আসতেন এবং বিনা মূল্যে রোগী দেখতেন ,আর অষুধ ক্লাব থেকে বিনা মূল্যে দেয়া হতো। এর জন্যে সকালে দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা আসতেন নাম লেখানোর জন্যে। সবমিলিয়ে এক টাকা জমা করে নাম লেখানো হত। আমি অবশ্য নিজেও এই কাজে অংশ নিতাম এবং নাম লেখানো,ওষুধ দেওয়া ,ডাক্টরবাবুকে নিয়ে আশা ইত্যাদি কাজে ভাগ নিতাম।বছর তিন চার করার পর রোগ এবং তার ওষুধ সম্পর্কে একটা সাধারণ জ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো আমার। কিছুদিন পর একটা অ্যাম্বুলেন্স টাটা ৪০৭ কিনে সেটাকেও সমাজ সেবায় লাগানো হলো। ক্লাব এর সদস্যরা পালাকরে ডিউটি করতো রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছনোর জন্যে। এটাও একটা মহৎ কাজ ছিল। তাছাড়া ক্লাবে বিকালে যোগ শিক্ষার ক্লাস ও ব্রতচারী শেখানো হতো। সব মিলিয়ে মনে হতো একটা সমাজ সেবার অঙ্গ। এবং ভালোই লাগতো সার্ভিস দিতে।
তাই দিনের একটা সময় ক্লাব কে দিতে হতো সেটা আনন্দের সাথেই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন